বোকার রাজনীতির দেশ

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক, সবুজ শস্যশ্যামল দেশ, যেখানে একাত্তরের রক্তস্নাত স্বাধীনতার স্বপ্ন এখনো বাতাসে ভাসে। কিন্তু সেই স্বপ্নের ভিতরে আজ এক অদ্ভুত, বিকৃত রাজতন্ত্র গড়ে উঠেছে গণতন্ত্রের নামে। এখানে ক্ষমতা আর অধিকারের নামে চলে এক ধরনের পরিবারতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী কর্তৃত্ব, যেখানে শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তৃতায় গণতন্ত্রের জয়গান হয়, আর তৃণমূলে চলে খুন, মাদক, চাঁদাবাজি আর ক্ষমতার লড়াই। এই বৈপরীত্যই আজ বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

রাজনীতির উপরের স্তরে দেখা যায় শিক্ষিত, বক্তৃতায় পারদর্শী নেতাদের। তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নিয়ে, আত্মত্যাগের কথা বলে রাজনীতিতে আসেন। কিন্তু তৃণমূলের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। স্থানীয় পর্যায়ের অধিকাংশ কর্মী-নেতা মাদকাসক্ত, বেকার, বখাটে যুবক যাদের একমাত্র যোগ্যতা হলো দলীয় আনুগত্য আর প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ক্ষমতা। এই তৃণমূল নেতারাই আসল ক্ষমতার চালক। তাঁদের হাতে থাকে ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি আর সন্ত্রাস। বড় নেতারা বিপক্ষ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বাসায় গিয়ে দাওয়াত খান, হাসি-ঠাট্টা করেন, কিন্তু একই সঙ্গে তৃণমূলকে এমন উস্কানিমূলক ভাষণ দেন যে, ফলাফল হয় রক্তপাত। এই দ্বিমুখী নীতি রাজনীতিকে একটি নোংরা খেলায় পরিণত করেছে।

ছাত্র রাজনীতির অবস্থা আরও করুণ। একসময় যেখানে ছাত্ররা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রবর্তী বাহিনী, আজ সেখানে মেধাবী, শান্তিপ্রিয় ছাত্রদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে সন্ত্রাসী ছাত্রসংগঠনের ক্যাডাররা। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের জন্য খুন-জখম, হল দখল, ভর্তি বাণিজ্য চলছে নিয়মিত। ফলে দেশের সেরা মেধা দেশত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। ব্রেইন ড্রেনের এই ধারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও দুর্বল করছে।

সাধারণ মানুষ এই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শিকার। প্রতিবাদ করলেই তাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ’, ‘দেশবিরোধী’, ‘জামাত-শিবির’ বা নতুন কোনো ট্যাগ লাগিয়ে নির্যাতন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক সময় দলীয় ক্যাডারদের হয়ে কাজ করে। আর ভোটের সময় সাধারণ মানুষও সচেতনতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়। অনেকে নীতি-আদর্শের চেয়ে টাকা, চাল, সামগ্রী দেখে ভোট দেয়। এই ক্রয়যোগ্য ভোটারদের কারণে রাজনীতি আরও নিচে নেমে যায়।

একজন বলে, “প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির সামনে দাঁড়ানোই রাজনীতি”—এই কথাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির নিম্নগামিতার প্রতীক। এখানে রাজনীতি আর জনকল্যাণের মাধ্যম নয়, বরং ক্ষমতা দখল ও টিকে থাকার একটি নোংরা খেলায় পরিণত হয়েছে। ফলে গণতন্ত্রের নামে চলছে এক ধরনের ‘ডাইনাস্টিক অথরিটেরিয়ানিজম’—যেখানে কয়েকটি পরিবার ও তাদের লোকজনের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, আর দেশের সাধারণ মানুষ থেকে যায় দর্শকের ভূমিকায়।

এই রাজনীতির সংস্কার না হলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, যুবশক্তির বিকাশ এবং সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কখনোই সম্ভব নয়। শিক্ষিত যুবসমাজ, সচেতন নাগরিক এবং একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম না হওয়া পর্যন্ত এই “বোকার রাজনীতির দেশ” তার নিজেরই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে থাকবে। সময় এসেছে এই অন্ধকার চক্র ভাঙার।