যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতাদের নিহতের পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে ইরানি বাহিনীর পাল্টা হামলায় দিশেহারা মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটিগুলো, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতারা। প্রথম আলো, রয়টার্স এবং আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় এই যুদ্ধে জড়িয়ে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন সেনাদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন স্থাপনায় ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা
গত শনিবার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত অন্তত নয়টি মার্কিন স্থাপনায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে সরাসরি ড্রোন আঘাত হেনেছে। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে রিয়াদে বিকট বিস্ফোরণের পর দূতাবাস ভবনে আগুন ধরে যায়। যদিও সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ক্ষয়ক্ষতি সামান্য এবং কেউ হতাহত হয়নি, তবে এই প্রথম কোনো কূটনৈতিক স্থাপনায় সরাসরি হামলা যুদ্ধের ভয়াবহতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।

শুধু সৌদি আরব নয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই এবং কাতারে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের ওপরও হামলা চালিয়েছে তেহরান। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত বাহরাইন, ইরাক, আরব আমিরাত এবং কুয়েতের সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) নিশ্চিত করেছে যে, কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটিতে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ছয়জন সেনা নিহত হয়েছেন এবং তিনটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। এছাড়া আরব সাগরে মোতায়েন করা মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনেও হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ২৭টি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরান সরকার।

দূতাবাস বন্ধ এবং মার্কিন নাগরিকদের সরে যাওয়ার নির্দেশ
যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে বাধ্য হচ্ছে ওয়াশিংটন। রিয়াদে হামলার পর সেখানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসসহ কুয়েত এবং লেবাননের দূতাবাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ১৪টি দেশ ও অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জরুরি ভিত্তিতে সরে যেতে নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

এই দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহরাইন, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিম তীর। তবে যুদ্ধের ডামাডোলে যখন পুরো অঞ্চলের আকাশপথ ও যোগাযোগব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, তখন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা কীভাবে নিরাপদে সরে যাবেন, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

ডেমোক্র্যাটদের তোপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন
ইরানে এই আগ্রাসী হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষ নেতারা দাবি করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে একটি অন্তহীন যুদ্ধে টেনে নিয়ে গেছে।

সিনেট ইন্টেলিজেন্স কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান মার্ক ওয়ার্নার স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সরাসরি কোনো আসন্ন হুমকি ছিল না। মূল হুমকি ছিল ইসরায়েলের প্রতি। ইসরায়েলের প্রতি হুমকিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে ট্রাম্প প্রশাসন সম্পূর্ণ অযৌক্তিক একটি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ক্যাপিটল হিলে এক ব্রিফিংয়ে স্বীকার করেছেন যে, ইসরায়েল একাই ইরানে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই হামলায় যোগ নাও দিত, তবুও ইসরায়েল হামলা চালাত এবং এর ফলে ইরানিদের পাল্টা হামলার শিকার হতো মার্কিন বাহিনী। ক্ষয়ক্ষতি কমাতেই যুক্তরাষ্ট্র যৌথ অভিযানে অংশ নিয়েছে।

রুবিওর এই ব্যাখ্যার তীব্র সমালোচনা করে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জোয়াকিন কাস্ত্রো বলেছেন, ইসরায়েল নিজের স্বার্থে মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকে বিপদে ফেলেছে। আর ট্রাম্প ইসরায়েলকে থামানোর বদলে উল্টো যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, যা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সাম্প্রতিক জনমত জরিপেও দেখা গেছে, বেশিরভাগ আমেরিকান নাগরিক ইরানে এই হামলার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

ইরানে মানবিক বিপর্যয় এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ
এদিকে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটেছে। টানা চার দিন ধরে চলা এই হামলায় ইরানের অন্তত ১৫৩টি শহরে বোমাবর্ষণ করা হয়েছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্যমতে, যৌথ বাহিনীর ৫০৪টি স্থানে এক হাজার ৩৯টি হামলায় অন্তত ৭৮৭ জন ইরানি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির ৪৯ জন শীর্ষ নেতা।

তেহরান শহরের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। ইসরায়েলি বোমার আঘাতে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধসে পড়েছে। শনিবার মিনাব শহরে মেয়েদের একটি স্কুলে হামলায় ১৬৫ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় জাতিসংঘ এবং ইউনেসকো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় থাকা 'গোলেস্তান প্রাসাদ' এবং তেহরানের পুরোনো পার্লামেন্ট ভবনও হামলার শিকার হয়েছে। রাজধানী তেহরান আজ ধোঁয়া আর রক্তের শহরে পরিণত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি ও আঞ্চলিক প্রভাব
ইরানও সামরিক দিক দিয়ে তীব্র জবাব দিচ্ছে। ইসরায়েলের মধ্যাঞ্চলে পেতাহ তিকভা শহর এবং তেল আবিবে রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গেও ইসরায়েলের যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করেছে, যেখানে ইসরায়েলে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে। ইরান ইতিমধ্যে কড়া হুমকি দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে তা জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।

এছাড়া আরব আমিরাতে ইরানের একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে ফুজাইরাহ তেল শিল্পাঞ্চলে আগুন ধরে যায়, যেখানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ওমানের দাকম বাণিজ্য বন্দরে একটি জ্বালানি তেলের ট্যাংকে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে এবং বাহরাইনেও ড্রোন হামলা চালিয়েছে আইআরজিসি।

হোয়াইট হাউসের অবস্থান এবং সরকার পতনের ছক
এত সমালোচনার পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছেন। হোয়াইট হাউসে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, যুদ্ধে তারা খুব ভালো অবস্থানে আছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য শুধু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করা নয়, বরং দেশটিতে শাসনব্যবস্থার পতন বা সরকার পরিবর্তন ঘটানো। ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভি নয়, বরং ইরানের ভেতরের কোনো নেতার হাতেই আগামী দিনের নেতৃত্ব দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

কবে থামবে এই যুদ্ধ?
যুদ্ধ কবে থামবে তা নিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতাদের মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধ শেষ হতে চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুদ্ধ বছরের পর বছর চলবে না।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল চাইছে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে আইআরজিসিসহ ইরান সরকারের মনোবল চিরতরে ভেঙে দিতে। অপরদিকে তেহরান প্রমাণ করতে চাইছে যে, তারাও অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ১৫টি জ্বালানি সরবরাহকারী সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে, যা প্রমাণ করে যে যুদ্ধ সহসাই থামছে না। ভিয়েনাভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুস্তাই আল জাজিরাকে জানান, এই যুদ্ধ দ্রুত থামবে নাকি দীর্ঘ মেয়াদে চলবে, তা আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হবে।

উপসংহার
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক ভয়াবহ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতির কারণে শুধু ইরান নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাসহ লাখ লাখ সাধারণ মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব ততটাই ধ্বংসাত্মক হবে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। [1]