কেনো ৩০০০০ টাকা বেতনের দাবি পোশাক শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি
ভোর ৬টা। চারপাশের আকাশ তখনো পুরোপুরি ফর্সা হয়নি। ঢাকার কোনো এক ঘিঞ্জি বস্তি বা টিনশেড কলোনি থেকে দলে দলে বের হচ্ছেন কিছু মানুষ। তাদের গন্তব্য কারখানার শেড। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর এই মানুষগুলোর ঘামে বোনা শার্ট-প্যান্ট ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে বিক্রি হয়ে দেশে আনছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স। কিন্তু মাস শেষে যখন তারা ঘরে ফেরেন, তাদের হাতে গুঁজে দেওয়া হয় মাত্র ১২,০০০ থেকে ১২,৫০০ টাকা।
এই সামান্য কাগজ কয়েকটা দিয়ে কি একটি জীবন চলে? নাকি একটি পরিবার বাঁচে? যখন পোশাক শ্রমিকরা রাজপথে নেমে ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকা বেতনের দাবি জানান, তখন সমাজের এক শ্রেণির 'সুশীল' ভ্রু কুঁচকে বলেন, "এতো টাকা কেন লাগবে? পোষাতে না পারলে গ্রামে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজ করুক।"
কিন্তু দূর থেকে দেওয়া এই পরামর্শ কতটা বাস্তবসম্মত? চলুন, একটু হিসাবের খাতা খুলে বসি এবং বাস্তবতার গল্পটা একটু মিলিয়ে দেখি।
জীবনযাপনের নিষ্ঠুর গণিত: একটি চার সদস্যের পরিবারের গল্প
ধরে নেওয়া যাক, একজন পোশাক শ্রমিকের পরিবারে সদস্য সংখ্যা চারজন—স্বামী, স্ত্রী এবং দুই সন্তান। ঢাকা বা এর আশেপাশের শিল্প এলাকায় (গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া) চারজনের এই পরিবারের মাথা গোঁজার জন্য অন্তত দুটি ছোট ঘর বা একটি চলনসই একরুমের সাবলেট প্রয়োজন।
- বাসা ভাড়া: গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিলসহ ন্যূনতম ১২,০০০ টাকা।
- চাল ও আটা: চারজনের মাসে অন্তত ৬০ কেজি চাল লাগে। বর্তমান বাজারে মোটা বা মাঝারি চালের দাম ৭২ থেকে ৮৫ টাকা। অর্থাৎ, শুধু চাল কিনতেই খরচ প্রায় ৪,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকা।
- মুদি বাজার: সয়াবিন তেল (২০৫-২১০ টাকা/লিটার), মসুর ডাল (১০৫-১৭০ টাকা/কেজি), পেঁয়াজ (১২০ টাকা/কেজি), সবজি, ডিম (১৬০ টাকা ডজন) এবং অন্যান্য মসলাপাতি মিলিয়ে খুব কৃপণতা করে চললেও মাসে ৮,০০০ টাকার নিচে মুদি বাজার সম্ভব নয়। গরুর মাংস (৮০০ টাকা/কেজি) তো তাদের কাছে এখন রীতিমতো রূপকথার গল্প।
- যাতায়াত ও টিফিন: কারখানায় যাওয়া-আসা এবং কাজের ফাঁকে হালকা নাস্তায় মাসে খরচ ন্যূনতম ২,০০০ টাকা।
- শিক্ষা ও চিকিৎসা: দুই সন্তানের স্কুল বেতন, খাতা-কলম এবং পরিবারের কারও হঠাৎ জ্বর-ঠান্ডায় ওষুধের খরচ মাসে অন্তত ৩,৫০০ টাকা।
সব মিলিয়ে একদম মৌলিক প্রয়োজন মেটাতেই একটি চার সদস্যের পরিবারের মাসিক খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ৩০,০০০ টাকার আশেপাশে। সেখানে মাস শেষে হাতে পাওয়া ১২,০০০ টাকা দিয়ে মাসের ১৫ তারিখ পার হওয়াই এক দুঃসাধ্য জাদুকরী বিদ্যা। তাহলে বাকি ১৫ দিন তারা কী খাবেন?
"গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করুক" সুশীলদের যুক্তির কঙ্কাল
শহরের জীবন যখন এতই কঠিন, তখন অনেকেই খুব সহজে বলে দেন—"গ্রামে গিয়ে জমি চাষ করুক।" কিন্তু গ্রামের কৃষির অবস্থা কি আসলেই ভালো? যারা এই কথা বলেন, তারা হয়তো দেশের কৃষিখাতের বর্তমান ক্ষতবিক্ষত রূপটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ।
গত চার বছরের হিসাব (২০২২-২০২৬) বলছে, কৃষিকাজ এখন আর লাভের মুখ দেখছে না; এটি পরিণত হয়েছে লোকসানের এক ফাঁদে।
- সারের আগুন দাম ও সংকট: সরকারিভাবে ইউরিয়া, টিএসপি বা এমওপি সারের দাম কেজিতে ২৭ থেকে ২০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকদের তা কিনতে হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। ১,৪০০ টাকার সারের বস্তা কিনতে হচ্ছে ১,৮০০ টাকায়।
- বীজের বাজারে ডাকাতি: সাধারণ ধানের বীজ ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ৩৫০ টাকা হয়েছে। হাইব্রিড বীজ ছুঁয়েছে ৬৫০ টাকার ঘর। ভুট্টা চাষে বীজ, সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ায় প্রতি বিঘায় উৎপাদন খরচ অন্তত ২,০০০ টাকা বেড়ে গেছে।
একজন কৃষক হাজারো কষ্টে, রক্ত পানি করে ফসল ফলান। কিন্তু ফসল যখন ঘরে ওঠে, তখন সেই ফসলের ন্যায্য দাম তিনি পান না। এক টাকার লাভ কৃষকের ঘরে যায় না, তা যায় দালাল এবং ফড়িয়াদের পকেটে। সকালে যে কৃষক এক বস্তা সবজি পানির দামে দালালের কাছে বেচে চোখের জল মুছতে মুছতে বাড়ি ফেরেন, বিকেলে সেই সবজি ঢাকার বাজারে বিক্রি হয় আকাশছোঁয়া দামে।
দুর্নীতির উইপোকা: যেখানে কৃষকের স্বপ্ন মরে
শুধু দাম বাড়াই শেষ কথা নয়, কৃষিখাতের পরতে পরতে আজ দুর্নীতির উইপোকা।
- সার আমদানি ও পরিবহনে চলছে হরিলুট। দুদক তদন্তে বিসিআইসি ও বিএডিসির প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার সার আমদানি অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। বাফার গুদামে পৌঁছানোর আগেই গায়েব হয়ে গেছে ৯০০ কোটি টাকার সার।
- কৃষকের হাতে দেওয়া হচ্ছে নিম্নমানের বীজ। ফরিদপুর, রাজবাড়ীতে সরকারি প্রণোদনার পেঁয়াজ বীজ বুনে ৮০ শতাংশ কৃষকের চারা গজায়নি।
- ডিলারশিপ দেওয়া হচ্ছে এমপি বা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের স্বজনদের।
যে কৃষক সারারাত জেগে জমিতে পানি দেন, তার লাভের গুড় খেয়ে যাচ্ছে এসি রুমে বসে থাকা দুর্নীতিবাজ আর দালালরা। এই ভয়ংকর মাফিয়া চক্রের সঙ্গে লড়াই করে একজন পোশাক শ্রমিক কীভাবে গ্রামে গিয়ে কৃষিকাজ করে পেট চালাবেন?
সিন্ডিকেটের যাঁতাকলে সাধারণ মানুষ
শহরে নিত্যপণ্যের বাজারও আজ গুটিকয়েক সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। তিন বছর আগের (২০২৩) তুলনায় চাল, তেল, ডাল, মুরগির মাংসের দাম আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণ মানুষের আয় যেটুকু বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি গতিতে।
দিন শেষে একজন পোশাক শ্রমিক না পারছেন শহরের বাজারে টিকে থাকতে, না পারছেন গ্রামে ফিরে গিয়ে মাটির বুকে নতুন স্বপ্ন বুনতে। তাদের চারপাশটা আজ দেয়াল দিয়ে ঘেরা।
গরিবদের দেখার কি কেউ নেই?
বর্তমান বাজারদরে, একটি চার সদস্যের পরিবারের জন্য ৩০,০০০ টাকা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ন্যূনতম বেঁচে থাকার রসদ। ১২,০০০ টাকার বেতনে জীবন চালানো মানে তিলে তিলে না খেয়ে মরা।
পোশাক শ্রমিকদের ৩০,০০০ টাকা বেতনের দাবি কোনো অযৌক্তিক আবদার নয়, এটি তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার শেষ আর্তনাদ। দুর্নীতি, দালাল চক্র আর সিন্ডিকেটের যাঁতাকলে পিষ্ট এই মানুষগুলোর দিকে তাকানোর কি সত্যিই কেউ নেই? রাষ্ট্র যদি সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারে, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে না পারে, তবে অন্তত ঘামে ভেজা শ্রমিকগুলোর বেঁচে থাকার মতো একটা ন্যায্য মজুরি তো নিশ্চিত করা উচিত।
কারণ, হিসাবের খাতায় ৩০,০০০ টাকা দিয়েও বর্তমান বাংলাদেশের বাজারে একটি পরিবারের সম্মানজনকভাবে বেঁচে থাকা (Cost of Living allowance বা COLA) প্রায় অসম্ভব।
তথ্যসূত্র ও ডেটা লিংক:
১. নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি (২০২৩ বনাম ২০২৬): The Financial Express, Prothom Alo
২. কৃষিখাতে সারের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকট: The Daily Star, TBS News
৩. বীজ ও উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি: New Age Bangladesh
৪. কৃষিখাতে দুর্নীতি (সার গায়েব ও নিম্নমানের বীজ): Pressenza - 2000 Cr Fertilizer Scam, Prothom Alo (Opinion on Onion Seeds)


